সো কল্ড বৈষম্য পাকিস্তান আমলে
চাকুরী এবং প্রশাসনে বৈষম্য(১)
পাকিস্তানি উপনিবেশ আমলের বৈষম্য: শিল্পখাত
___
ব্রিটিশ এবং হিন্দু জমিদারদের সোনালি যুগে বাংলার যাবতীয় শিল্পের উন্নতি হয় পশ্চিম বাংলা তথা কলকাতায়। অবিভক্ত বাংলায়:
১। পাটকল ছিল ১০৮টি
২। লৌহ এবং ইস্পাত কল ছিল ১৮ টি
৩। কাগজ কল ছিল ১৬টি
এগুলো সবই ছিল পশ্চিম বাংলায়, পূর্ব বাংলায় একটিও ছিল না। এর বাইরে—
১। সুতাকল ছিল ৩৮৯ টি (এর মধ্যে পূর্ব বাংলায় ৯০টি)
২। চিনিকলের ছিল ১৬৬টি (এর মধ্যে পূর্ব বাংলায় ১০টি)
৩। সিমেন্ট কারখানার ছিল ১৯টি (এর মধ্যে পূর্ব বাংলায় ৩ টি)
এরমধ্যে সিলেটের ছাতকে অবস্থিত সিমেন্ট কারখানাকে চুনাপাথর সরবরাহের জন্য ভারতের আসামের ওপর নির্ভর করতে হতো। পূর্ব পাকিস্তানের সুতাকলগুলিকেও আমদানিকৃত কাঁচামালের ওপর নির্ভর করতে হতো।
১৯৪৭ শুরু হয় পাকিস্তানি উপনিবেশ শাসন। এই সময়ে ব্রিটিশ এবং হিন্দু জমিদারদের শুরু হওয়া অসাধারণ শিল্পায়ন থেমে যায়। বাংলাপিডিয়া পাকিস্তান আমলে হওয়া শিল্প প্রতিষ্ঠানের একটা তালিকা দিয়েছে।
১৯৭০ সালে পূর্ব পাকিস্তানে বিভিন্ন খাতে প্রতিষ্ঠান ছিল—
১। শিল্প প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ছিল খাদ্য উৎপাদনকারী ৪০৮টি।
২। পানীয় প্রস্ততকারী প্রতিষ্ঠান ছিল ৬টি।
৩। তামাক প্রক্রিয়াকরণ শিল্প ২৬টি।
৪। বস্ত্র শিল্প ৭৯২টি।
৫। পাদুকা শিল্প ২০৪টি।
৬। কাঠ ও ছিপি শিল্প ১৪টি।
৭। আসবাবপত্র শিল্প ৭০টি।
৮। কাগজজাত দ্রব্য উৎপাদন শিল্প ৩৩টি।
৯। মুদ্রণ ও প্রকাশনা শিল্প ১৪টি।
১০। রাসায়নিক দ্রব্য উৎপাদন শিল্প ৫৭২টি।
১১। পেট্রোলিয়াম ও কয়লাজাত পদার্থ শিল্প ৩টি।
১২। রাবারজাত দ্রব্য উৎপাদন শিল্প ৩টি।
১৩। খনিজ পদার্থ শিল্প ৫৩টি।
১৪। মৌলিক ধাতু শিল্প ৩৫টি।
১৫। ধাতব দ্রব্য শিল্প ২৫৭টি।
১৬। অবৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতি শিল্প ৮৮টি।
১৭। বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতি শিল্প ৩৪টি।
১৮। যোগাযোগ যন্ত্রপাতি শিল্প ৬৫টি।
১৯। অন্যান্য দ্রব্যের প্রতিষ্ঠান ছিল ১৬৬টি।
১৯৭১ সালে সুমহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে পূর্ব বাংলা পাকিস্তানি উপনিবেশ থেকে মুক্তি পায়। এবং আবার শিল্পের সোনালি দিন শুরু হয়।
১৯৭১ সালে পূর্ব বাংলার মহান বন্ধু রাষ্ট্র ভারত পূর্ব পাকিস্তানের বিভিন্ন শিল্প-কারখানার যন্ত্রাদি এবং কলকব্জা লুটপাট করে। ২১শে জানুয়ারি ১৯৭২ সালে ব্রিটেনের বিখ্যাত গার্ডিয়ান পত্রিকায় সাংবাদিক মার্টিন ঊলাকট (Martin Woollacott) Indians ‘loot whole factory ‘শিরোনামে লেখেন ;
❝ খুলনা এলাকায় ভারতীয় সেনারা পরিকল্পিত উপায়ে মিল, কারখানা এবং অফিস লুট করে যা এখানে বাংলাদেশের বেসামরিক কর্মকর্তাদের ক্ষুব্ধ ও ক্ষুব্ধ করেছে। ১৭ ডিসেম্বর ভারতীয় সৈন্যরা শহরে আসার পর প্রথম কয়েক দিনের মধ্যে লুটপাট শুরু হয়। ❞
তবে শুধু শিল্প কারখানার সামগ্রী নয়, গাড়ি, আসবাবপত্র, খাবার, এমনকি বাথরুমের ফিটিং পর্যন্ত নিয়ে যায় বাঙালির অকৃত্রিম বন্ধু হিন্দুস্তানি সেনাবাহিনী।
ভারতীয় সাহিত্যিক সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় তাঁর পূর্ব-পশ্চিম উপন্যাসে এই লুটপাটের একটা নমুলা উল্লেখ করেন—
❝ ঢাকায় এতসব বিদেশী জিনিস পাওয়া যায়, এসব তো আগে দেখেনি ভারতীয়রা। রেফ্রিজারেটর, টিভি, টু-ইন-ওয়ান, কার্পেট, টিনের খাবার-এইসব ভর্তি হতে লাগলো ভারতীয় সৈন্যদের ট্রাকে। ❞
১৯৭২ সালে রেহমান সোবহানের প্রেসক্রিপশনে "স্বাধীন" বাংলাদেশে রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্পখাতের কার্যক্রম আরম্ভ হয়। অবশ্য রাষ্ট্রায়ত্ত খাতের কলকারখানাগুলি প্রধানত অব্যবস্থা ও সম্পদ পাচারের ফলে শীঘ্রই লোকসানি প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়।
সরকারকে অতি তাড়াতাড়ি রাষ্ট্রায়ত্ত খাতের ওপর কর্তৃত্ব সংক্রান্ত নীতি পুনর্বিবেচনা করতে হয় এবং শিল্পসমূহের ওপর রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ অব্যাহত রেখেও ব্যক্তিগত বিনিয়োগের অনুমোদনযোগ্য সর্বোচ্চ সীমা বৃদ্ধি করা হয়। এতে অবস্থার তেমন কোন উন্নতি হয় নি। পরবর্তীতে ১,০৭৬টি রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন শিল্প প্রতিষ্ঠান ব্যক্তি মালিকানায় হস্তান্তর করা হয়।
নব্য সম্পদশালীদের অনভিজ্ঞতার কারণে হস্তান্তরিত শিল্পসমূহ রুগ্ন হয়ে পড়লে বিরাষ্ট্রীয়করণ নতুন সমস্যার সৃষ্টি করে। ব্যক্তি মালিকদের অনেকেই শিল্প উন্নয়ন ও চালু রাখার পরিবর্তে সস্তায় প্রাপ্ত সম্পত্তি বিক্রয় করে নগদ অর্থ অর্জনে ব্যস্ত হয়ে পড়ে।
ফলে শিল্পরুগ্নতা দেখা দেয় এবং খাদ্য উৎপাদনকারী শিল্পসমূহের ৫০%, বস্ত্র শিল্পসমূহের ৭০%, পাট খাতের শিল্পসমূহের ১০০%, কাগজ ও কাগজ বোর্ড শিল্পসমূহের ৬০%, চামড়া ও রাবার শিল্পসমূহের ৯০%, রসায়ন ও ঔষধ শিল্পসমূহের ৫০%, গ্লাস ও সিরামিক্স শিল্পের ৬৫% এবং প্রকৌশল শিল্পসমূহের ৮০% ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
সংগৃহীত ... মীর সালমান
Tags:
অন্যান্য তথ্য