১৯৪৮ সালের ২১শে মার্চ ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে প্রদত্ত কায়েদে আজম মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ’র ভাষণ
আসসালামু
আলাইকুম
আসসালামু আলাইকুম
আসসালামু আলাইকুম
আমি
প্রথমে সম্মানিত আয়োজক কমিটির চেয়ারম্যানের মাধ্যমে ঢাকা এবং এ
প্রদেশের সকলের নিকট আমাকে এই
সম্বর্ধনা জানানোর জন্য কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন
করছি। পূর্ব বাংলা পাকিস্তানের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এ অঞ্চলে
পৃথিবীর এক বিরাট সংখ্যক
মুসলমান, একটি নির্দিষ্ট সংস্কৃতি
ও ঐতিহ্যের অধিকারী হয়ে বসবাস করছে।
এ অঞ্চল সম্পর্কে অনেক গুরুত্বপূর্ণ কথা
বলার ছিল, কিন্তু কিছুটা
দেরিতে আপনাদের সামনে হাজির হলাম।
আপনারা
অবশ্যই কতগুলো জরুরি বিষয় জানেন যে, ভারত বিভক্তির
সাথে সাথে পাকিস্তানে কী
ঘটনা ঘটে গেছে। পূর্ব
পাঞ্জাব, দিল্লী এবং এর নিকটবর্তী
এলাকাগুলি থেকে, এখানে বসবাসরত মুসলমানদেরকে, তাদের বাসস্থান, ঘরবাড়ি থেকে তাড়িয়ে দেওয়া
হয়েছে। এসব নিপীড়িত মুসলমানদের
বাসস্থানের ব্যবস্থা করা এবং পুনর্বাসনের
জন্য পশ্চিম পাকিস্তানে আমাদেরকে ব্যবস্থা নিতে হয়েছে। পৃথিবীর
ইতিহাসে এমন ঘটনা খুব
কমই দেখা যায় যে,
একটি নতুন রাষ্ট্রকে এত
বড় কঠিন সমস্যার সম্মুখীন
হতে হয়েছে। আল্লাহর মেহেরবানীতে সদ্য প্রতিষ্ঠিত রাষ্ট্রের
পক্ষে এই বিরাট এবং
কঠিন সমস্যা অত্যন্ত যোগ্যতা ও সাহসের সাথে
মোকাবেলা করা সম্ভব হয়েছে।
আমাদের দুশমনদের অনেক ধারণা ছিল,
পাকিস্তান অচিরেই ধ্বংস হয়ে যাবে। কিন্তু
আমরা তাদের সেই ধারণাকে ভুল
প্রমাণ করে, তাদের চ্যালেঞ্জকে
কঠিন সমস্যার সমাধানে পাকিস্তান সক্ষম হয়েছে এবং পাকিস্তান দিন
দিন শক্তিশালী হয়ে উঠেছে। পাকিস্তান
টিকে থাকার জন্যই এসেছে এবং যে উদ্দেশ্য
নিয়ে এদেশটির জন্ম হয়েছে, আমরা
সেই লক্ষ্যে কাজ করে যাব।
এই
সম্বর্ধনা সভায় যে সব বক্তব্য
হয়েছে, তাতে আপনারা বলেছেন
যে, বিশাল সম্ভাবনাময় এই প্রদেশের কৃষি
এবং শিল্পখাতকে জোরদার করে তুলতে হবে।
এ প্রদেশের তরুণ, যুবক এবং নারীদের
যোগ্য নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়
প্রশিক্ষণ দেওয়ার ব্যবস্থা নিতে হবে। দেশের
সম্পদসমূহে এ অঞ্চলের মানুষ
যেন যথাযথ ভূমিকা পালন করতে পারে,
সে ব্যবস্থাকে নিশ্চিত করতে হবে। চট্টগ্রাম
বন্দর উন্নয়নের কথা বলেছেন। পশ্চিম
পাকিস্তানের সাথে এই প্রদেশের যোগাযোগ, স্বাস্থ্য
এবং সুশাসন করার কথা বলেছেন। শিক্ষা বিস্তারের কথা বলেছেন। সর্বক্ষেত্রে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা
দেবার দিকেও বলেছেন যে, পাকিস্তানের এই পূর্ব অংশের প্রতিটি নাগরিক যেন, তাদের অধিকার
থেকে কোনোভাবেই বঞ্চিত না হয় এবং সরকারের প্রতিটি স্তরে তাদের ন্যায্য হিস্যা নিশ্চিত
করা হয়।
আমি
এখনই আপনাদের আশ্বস্ত করতে চাই, আপনাদের উন্নতি নিশ্চিত এবং ন্যায্য দাবিসমূহ কীভাবে
এবং কত তাড়াতাড়ি পূরণ করা যায় তার জন্য, আমার সরকার অত্যন্ত গুরুত্বসহকারে বিবেচনা
করবে। আপনাদের উত্থাপিত দাবিসমূহের অনেকগুলি বাস্তবায়নের কাজ ইতোমধ্যে হাতে তুলে নিয়েছে
এবং কোন রকম শিথিলতা ছাড়াই কাজ করে যাচ্ছে। বিষয়গুলি ভেবে দেখা হবে বলে, সময় নষ্ট
করার পক্ষপাতী থাকব না। পাকিস্তানের এই অংশ, তার ন্যায্য ও পূর্ণ পাওনা হতে বঞ্চিত
নয়। তাদের সকল অধিকার এই অঞ্চলের ইতিহাস বলে, পূর্ব বাংলার মানুষের শক্তি, সাহস এবং
মেধার মাধ্যমে এক নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলেছে। সরকার এ প্রদেশের তরুণ ও যুবকদের জনশক্তিতে
রূপান্তরের জন্য তাদেরকে প্রয়োজনীয় ট্রেনিং প্রদানের কর্মসূচি হাতে নিয়েছে। সরকার
এদেশের যুবকদের, তাদের নিজ দেশের সম্পদসমূহ এবং পাকিস্তানের গঠনে যথাযথ ভূমিকা পালনের
পথ খুলে দিয়েছে এবং খোলা থাকবে। আমি একথা জোর দিয়ে বলতে চাই, দেশের সার্বভৌমত্বে
পূর্ব বাংলার তরুণরা যোগ দিয়ে নিজ দেশকে দুষ্কৃতকারীদের হাত থেকে রক্ষা করার জন্য
জীবন বিলিয়ে দেওয়ার অধিকার থেকে, তাদেরকে বঞ্চিত করার কোন প্রশ্নই উঠতে পারে না।
এবার
আমি এ প্রদেশের অন্য কিছু নিয়ে কথা বলবো। সে কথা বলার আগে আমি পূর্ব বাংলার অধিবাসী
এবং সরকারকে আরেকবার মোবারকবাদ জানাতে চাই এজন্য যে, গত সাত মাসে আপনারা দেশ গড়ার
কাজে বহু কষ্ট এবং ত্যাগ স্বীকার করেছেন। ভারত ভাগ হওয়ার পরবর্তীতে যে অবস্থা এবং
বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হয়েছিল, তার ঢেউ ঢাকার উপরেও পড়েছিল। সে অবস্থাকে একটি শৃঙ্খলার
মধ্যে ফিরিয়ে আনতে এখানকার অভিজ্ঞ ও ত্যাগী প্রশাসন, দক্ষতা ও শ্রমের পরিচয় দিয়ে
যে পরিশ্রম করেছেন তার জন্য তাদেরকে জানাই আমার শ্রদ্ধা এবং সালাম। ১৯৪৭ সালের ১৫ আগস্ট
তারিখে ঢাকার সরকার নিজ দেশের মধ্যেই যেন পরবাসী ছিল। ভারত থেকে চলে আসা হাজার হাজার
সরকারি কর্মচারী ও কর্মকর্তাদের এখানে মাথা গোঁজার মত, কোন বাসস্থানের ব্যবস্থা ছিল
না। গোটা ১৫ আগস্টের আগে ঢাকা ছিল একটি মফস্বল টাইপ শহর। সুচারুভাবে উঠে দাঁড়াতে পারেনি,
এমন একটি নবগঠিত প্রশাসনের নিকট বিরাট মাথা ব্যথার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছিল, ভারতের
রেলওয়ে সহ অন্যান্য দপ্তরের প্রায় ৭০ হাজার কর্মচারীদের পরিবার পরিজনের আশ্রয় দান
এবং পুনর্বাসন করা। ভারত বিভাগের কারণে সৃষ্ট গোলযোগ, শ্রমিক এবং অনেকটা ভয়ের মুখে
এসব লোকেরা কলকাতা ও ভারতের বিভিন্ন এলাকা থেকে জীবন বাঁচাবার জন্য এখানে পালিয়ে আসতে
বাধ্য হয়।
একইভাবে
এখান থেকে হিন্দুরা পাকিস্তান ত্যাগ করার ফলে প্রশাসনে হঠাৎ শূন্যতা সৃষ্টি হয়ে যায়।
প্রশাসন, যোগাযোগ এবং পরিবহন ব্যবস্থা ভয়াবহ বিপর্যয় নেমে আসে। এই সময় প্রশাসনের
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ হয়ে দাঁড়ায়, দ্রুত সময়ের মধ্যে প্রশাসনকে সংগঠিত ও সচল
করে তোলা। জনগণের প্রত্যাশা পূরণ করে প্রদেশকে বাঁচিয়ে তোলা। আমাদের নতুন প্রশাসন
কঠিন পরীক্ষার চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করে সীমাহীন ত্যাগ এবং কঠোর শ্রম দিয়ে পরিস্থিতিকে
নিয়ন্ত্রণে এনেছে। প্রশাসনের কর্মকর্তারা কঠোর পরিশ্রম করে মানুষের জীবন যাপনকে সহজ
এবং স্বাভাবিক রেখেছেন। আরেকটি অতি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় প্রশাসন কেবল নিজেদের সংগঠিত
করে তুলেনি প্রশাসনের ব্যবস্থায় দুর্বলতা, যে দুর্নীতির আভাস দেখা দিয়েছিল, তাকেও
মোকাবেলা করা সম্ভব হয়েছে। নতুন প্রশাসন আইন-শৃঙ্খলা রক্ষার গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব
সুচারুভাবে পালন করেছে।
একই
সাথে ব্যবসাবাণিজ্য সমাধানের জন্য জনগণ বিশাল উৎসাহের সাথে এগিয়ে এসেছে। আপনাদেরকেও
ধন্যবাদ জানাই। ধন্যবাদ এ অঞ্চলের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনসম্প্রদায় প্রতি। তারা এ রাষ্ট্র
গঠনে এবং পরবর্তীতে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষায় উদাহরণ সৃষ্টি করেছেন। স্মরণ রাখা দরকার যে,
ভারত ভাগ হওয়ার পরবর্তী কয়েকটি মাসে লাগাতারভাবে, ভারতের সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমান সম্প্রদায়ের
ওপর যে নারকীয় তাণ্ডব, জুলুম এবং হত্যাকাণ্ড নেমে এসেছিল, এসব উপদ্রবের মুখেও এদেশবাসী
চরম সংযমের পরিচয় দিয়েছেন। এত ভয়াবহ অবস্থা ঘটে যাওয়া সত্ত্বেও পূর্ববাংলায় এবারের
পূজার সময় হিন্দু ভাইয়েরা প্রায় ৪০ হাজার মিছিল বের করেছেন। এসব মিছিলে কোন অপ্রীতিকর
ঘটনা ঘটেনি এবং উৎসব পালনে কোন বিঘ্ন বা বাধার খবর আমার কাছে আসে নি।
যে
কোন নিরপেক্ষ পর্যবেক্ষক আমার সাথে একমত হবেন যে, গত কয়েকেক মাসে সারা ভারত জুড়ে
যে মহাতাণ্ডব ঘটে গেল, তার প্রতিক্রিয়া পাকিস্তানে কিছুই ঘটেনি বরং এদেশের সংখ্যালঘুদের
জান-মাল নিরাপত্তায় কঠোর নজর রাখা হয়েছে। আপনারা নিশ্চয়ই একমত হবেন যে, পাকিস্তান
আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা করতে সক্ষম। কেবল ঢাকার সংখ্যালঘুরা নয়, সারা পাকিস্তানের সংখ্যালঘুরা
অনেক দেশের চেয়ে এখানে অধিক নিরাপদে আছেন এবং তারা জীবনহানির ঘটনার কোন আশঙ্কায় শঙ্কিত
নন। আমরা যে কোন মূল্যে এবং কঠোর হাতে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতিকে নিয়ন্ত্রণে রাখবো এবং
শান্তি বিঘ্নিত হতে দেবো না। আমার সরকার কোনরূপ বলপ্রয়োগ অথবা গণউত্তেজনা সৃষ্টি হতে
দেবে না। আমি আবারও একই কথার উল্লেখ করছি, সদ্য প্রতিষ্ঠিত একটি দেশ, ত্যাগ স্বীকারকারী
একটি প্রশাসন গড়ে তোলা, অবশ্যম্ভাবী দুঃখজনক ঘটনার জন্য প্রায় ৪ কোটি মানুষের খাদ্যের
সমস্যা এবং শান্তি বজায় রাখা আমাদের সরকারের জন্য বিরাট চ্যালেঞ্জ ছিল। অনেকের প্রশাসনের
এসব সামান্য বিষয়গুলোর অন্তরালে লুকিয়ে থাকা জটিলতা এবং প্রকৃত অবস্থার গভীরতা বুঝতে
কষ্ট হয়। এটি যে অত সহজ কিছু তা ধারণা করা মোটেও উচিত হবে না।
সমালোচনা
করা সহজ। দোষ বের করা আরও সহজ। জনগণের জন্য যেসব ব্যবস্থা নেওয়া হয় অতি তাড়াতাড়ি
তা সবার ভুলে যায়। সেসব কার্যক্রম বাস্তবায়ন করতে যে পরিমাণ পরিশ্রম করতে হয়, তা
একদিনে ভুলে যায়। অথচ পাকিস্তানের আজাদীর সূচনায় আমাদেরকে কত পরীক্ষা, বিপদ, দুর্ভিক্ষে
পড়তে হয়েছে, কত ক্ষণ ধৈর্য ধরতে হয়েছে এবং পাকিস্তান লাভের পর গত কয়েকটি মাসের
কঠিন সমস্যাগুলি সমাধান করতে কী সব দিন কেটে গেছে তা কি এই জনগণের মনে পড়ে? মনে আছে
কি?
প্রশাসনের
কথা বার বার এসে যাচ্ছে। আমি জানি, আমরা যা যা আকাঙ্ক্ষা করছি তা পুরোটা বর্তমান প্রশাসন
মিটাতে পারছে না অথবা এ শাসন ব্যবস্থায় অনেক খুঁত রয়ে গেছে। আমি বলিনি যে, এই অবস্থাকে
উন্নত করা সম্ভব নয়। এমনটিও নয় যে, একজন দেশপ্রেমিকের সমালোচনা গ্রহণ করা যাবে না।
বরং সৎ সমালোচনাকারীদের প্রতি আমার আহ্বান, আপনারা আমাদের ভুল ধরিয়ে দিতে সাহায্য
করুন। কিন্তু আমি যখন দেখি, কিছু কিছু মহল কেবল অভিযোগের পর অভিযোগ করে যাচ্ছে এবং
আমাদের দোষ খুঁজে বেড়াচ্ছে; যেসব ভালো কাজ করা হয়েছে তার প্রশংসা বা সামান্য স্বীকৃতি
দিতে বড় কুণ্ঠাবোধ করেন, তখন সরকারের যারা আছেন এবং প্রশাসনের নিবেদিত কর্মচারী ও
কর্মকর্তাবৃন্দ যারা দেশের জন্য দিনরাত অক্লান্ত খেটে মরছেন তাদের মাঝে নেমে আসে গভীর
হতাশা। আর এজন্য স্বাভাবিকভাবেই আমিও বেশি কষ্ট পাই।
তাই
তাদের বলবো, আমরা যেসব ভালো কাজ করেছি তার প্রশংসা না করতে পারেন তবু না করুন। অথচ
অভিযোগ এবং সমালোচনা করে জনগণকে বিভ্রান্ত করবেন না। একটা দেশের বিরাট প্রশাসনের মধ্যে
অবশ্যই ভুলত্রুটি কিছু না কিছু ঘটতে পারে বা ঘটছে। মানুষের পক্ষে শতভাগ একান্তভাবে
নির্ভুল ও সুবিচারপূর্ণ প্রশাসন নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। এতদসত্ত্বেও আমাদের লক্ষ্য
থাকবে, পাকিস্তানের প্রশাসনকে যতটা সম্ভব অন্যায় ও দুর্নীতি থেকে মুক্ত রেখে দক্ষ
এবং গতিশীল একটি কর্মক্ষম প্রশাসন হিসেবে গড়ে তোলা। আপনারা প্রশ্ন করতে পারেন কীভাবে
এ ব্যবস্থা অর্জন করা যাবে? হ্যাঁ, সরকারের উদ্দেশ্য এবং লক্ষ্য পরিষ্কার করে তুলে
ধরে আমাদের আকাঙ্ক্ষিত প্রশাসন গড়ে তোলা সম্ভব। সরকার কিভাবে জনগণের সেবা করতে চায়,
সরকার কী কী পরিকল্পনা নিয়েছে এবং এসব পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য কী কর্মসূচি হাতে
নিয়েছে তা জনগণকে স্পষ্টভাবে জানিয়ে রাখা হবে। আপনারা জেনে রাখুন, সরকার বদলের ক্ষমতা
এখন আপনাদেরই হাতে। আপনারাই হাতে করে আপনার দেশের ভবিষ্যৎ গড়বেন। আপনারা সরকারকে ক্ষমতায়
রাখতে পারেন আর আপনারাই অপসারণ করে এই সরকারকে ক্ষমতা থেকে নামিয়ে দিতে পারেন। ক্ষমতার
এই পরিবর্তন গণতান্ত্রিক পদ্ধতির মধ্যেই হতে পারে। আপনাদের হাতে যে ক্ষমতা এসেছে, সেই
ক্ষমতাকে নিয়ম মেনে ব্যবহার করতে হবে এবং অনুশীলন করতে হবে। আমাদের রাষ্ট্রের পরিচালনা
এবং পরিবেশের নিয়ন্ত্রণ সৎভাবে করতে হবে। শাসনতান্ত্রিক নিয়মের ভিত্তিতেই, এক সরকার
বদলে অন্য সরকার আসবে এবং যাবে।
সরকার
বদলের ক্ষমতা এখন আপনাদেরই হাতে। আমি আপনাদের কাছে অনুরোধ রাখবো, আপনারা যারা অধিক
দায়িত্বের পরিচয় দেন। বর্তমানে যারা সরকারের হাল ধরে আছেন তাদেরকে সমর্থন দিন। তাদের
সাথী হোন। তারা যে, অনুকূল, সীমাবদ্ধতা এবং দুরাবস্থার মধ্যে দিয়ে কাজ করে যাচ্ছেন,
তাদের প্রতি সহানুভূতি প্রকাশ করুন। তাদের পক্ষে আপনাদের সকল সমস্যা রাতারাতি পূরণ
করা যে একান্তই অসম্ভব, সেটাও উপলব্ধি করার চেষ্টা করুন। আপনারা সহযোগিতার হাত আরো
বাড়িয়ে দিলে, আমাদের দেশের সমস্যা শুধু দূর হয়ে যাবে না বরং সারা দুনিয়ার মধ্যে
আমাদের প্রিয় দেশটি একটি শক্তিশালী রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে উঠবে।
আমার
সর্বশেষ প্রশ্ন এই লক্ষ জনতার কাছে, আপনাদের পূর্বপুরুষদের বহু ত্যাগের বিনিময়ে অর্জিত
এই দেশটিকে রক্ষা করবেন নাকি আমাদের বোকামির জন্য দেশটিকে ধ্বংস করে দেবেন? আপনারা
কি চান এই দেশটি সমৃদ্ধ হয়ে উঠুক? আমি জানি, আপনারা নিজ দেশের ধ্বংস চাইবেন না বরং
জীবনকে বিলিয়ে দিয়ে দেশটিকে হেফাজত করবেন। এজন্য দরকার একটি কাজের। সেটি হলো আমাদের
সকলের মধ্যে সীমার প্রাচীরের মত ঐক্য এবং সংহতি। আপনারা জেনে রাখুন, আমাদের প্রাণের
বিনিময়ে অর্জিত দেশটির মধ্যে গোলযোগ সৃষ্টি করতে আমাদের দুশমনরা বসে নেই। আমাদের মধ্য
থেকে, আমাদের মানুষকে বেছে নিয়ে এবং অর্থ দিয়ে আমাদের ভবিষ্যতের সকল স্বপ্নকে ধ্বংস
করে দিতে তারা ইতোমধ্যে উদ্যমী হয়েছে। আমার আকুল আহ্বান, আপনারা এসব ষড়যন্ত্র সম্পর্কে
সতর্ক থাকুন। এদের মনভোলানো এবং আকর্ষণীয় স্লোগানের মায়াজাল থেকে দূরে থাকার আকুল
অনুরোধ করে গেলাম।
এরা
বলা শুরু করেছে পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকার এবং পূর্ববাংলার প্রাদেশিক সরকার এ প্রদেশের
মাতৃভাষা বাংলা ধ্বংসের ষড়যন্ত্র হাতে নিয়েছে। এর চেয়ে বড় মিথ্যা আর কিছুই হতে
পারে না। আমি সুস্পষ্টভাবে এবং পরিষ্কার ভাষায় বলতে চাই, আমাদের ঐতিহাসিক দুশমনদের
এজেন্ট এবং অনেক কমিউনিস্ট আমাদের মাঝে ঢুকে পড়েছে। আপনারা যদি এদের ব্যাপারে সজাগ
না থাকেন, তবে এরা আমাদের সাথে করে দিতে চায়। আমি বিশ্বাস করি, যতটুকু চেষ্টাই তারা
করুক, তাদের ব্যর্থতা নিশ্চিত। আপনারা যেন এদের সাথে মিশে ফেলতে না চান। আমার দৃঢ়
বিশ্বাস, পূর্ববাংলার জনগণ কখনোই তাদেরকে সমর্থন করবে না এবং নিজেদের দেশকে ধ্বংসের
পথে নিয়ে যাবে না।
আমাকে
জানানো হয়েছে যে, পশ্চিম থেকে হিন্দু সম্প্রদায়ের বহু লোক দেশত্যাগ করেছে। ভারতের
পত্রিকাগুলি দেশত্যাগকারী মানুষের সংখ্যা দশ লক্ষাধিক বলে মিথ্যা সংবাদ ছাপাচ্ছে। আমাদের
সরকারের হিসাবমতে এই সংখ্যা বেশী করে ধরলেও দুই লাখের উপরে যাবে না। এছাড়া আমি একটি
অভিযোগ করছি এজন্য যে, সংখ্যাগুরু সম্প্রদায়ের কিছু ভাইয়েরা দেশত্যাগ করেছেন তারা
কিছু মুসলমান সম্প্রদায়ের নির্যাতনের কারণে দেশত্যাগ করেছেন না। আমাদের দেশের সংখ্যালঘুরা
যে স্বাধীনতা অর্জন করেছে এবং নিজেদের রাষ্ট্রের সম্পদ উপভোগ করছেন ঠিক একই অধিকার
ভারতের সংখ্যালঘুরা পাচ্ছেন না।
তাদের
দেশত্যাগের কারণগুলি ভালোভাবে বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে ভারতের সাম্প্রদায়িক ও যুদ্ধবাদী
নেতাদের বক্তব্য কথাবার্তাই এর অন্যতম কারণ। তারা গুজব ছড়িয়ে দিচ্ছে পাকিস্তান ভারতের
মধ্যে শীঘ্রই যুদ্ধ বেঁধে যাবে। তাছাড়া ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে সংখ্যালঘুদের ওপর যে
অত্যাচার এবং নির্যাতন চলছে তার প্রতিক্রিয়া এখানেও দেখা দেবে। অনুরূপ এই ভয় এবং
নির্যাতনের আশঙ্কায় অনেক হিন্দু দেশত্যাগ করেছেন। তাছাড়া ভারতের কতিপয় পত্রিকায়
হিন্দুদেরকে পাকিস্তান ত্যাগ করতে আসার জন্য অবিরত প্রলোভন চালানো হচ্ছে। এদের যোগসাজশে
সংখ্যালঘুদের উপর অত্যাচার, নির্যাতনের মনগড়া ও মিথ্যা কাহিনীও ছড়ানো হচ্ছে। ভারতের
হিন্দু মহাসভা এদের মদত দিয়ে যাচ্ছে। এ সকল মিথ্যা প্রচারণা সত্ত্বেও সংখ্যালঘু সমাজের
প্রায় ৯০ শতাংশ মানুষ শান্তিতে তাদের নিজ জন্মভূমিতে বসবাস করছে এবং অন্যত্র যাবার
চিন্তা প্রত্যাখ্যান করছে। আমি আবারও উল্লেখ করতে চাই, আমরা পাকিস্তানে সংখ্যালঘুদের
ন্যায্য অধিকার ভোগ করার ক্ষেত্রে কোন বৈষম্য বা বিধিনিষেধ রাখবো না। ভারতের চাইতে
পাকিস্তানে সংখ্যালঘুদের জানমালের হেফাজত রাখার প্রশ্নে আমরা কঠোর সংকল্পবদ্ধ। পাকিস্তানের
আইন, শৃঙ্খলা এবং প্রতিটি মানুষের পূর্ণ নাগরিক অধিকার রক্ষায় আমরা কোন সম্প্রদায়,
শ্রেণী এবং জাতির বিভেদকে বরদাস্ত করবো না।
ভাল
বলছি কী মন্দ বলছি জানিনা। সবার কাছে প্রীতিকর নাও হতে পারে। আমি কিছু নাজুক কথা এখন
বলবো। আমাকে জানানো হয়েছে যে, এখানে আসা অবাঙালি মুসলমানদের বিরুদ্ধে কোন কোন মহল
স্থানীয় মুসলমানদের দিয়ে জাতিগত বিদ্বেষ ছড়ানোর পথ বেছে নিয়েছে এবং একই সাথে অভিন্ন
শিক্ষা ব্যবস্থার মাধ্যমে পাকিস্তানের জাতীয় কার্য পরিচালনার উপযোগী নাগরিকতা গড়ে
তোলার কথা বলা হয়েছে, যা একটি ঐক্যবদ্ধ জাতি গঠনের পথে নিয়ে যাবে। আমি এই কথা বলতে
পারি যে, এরা সজাগভাবে তাদের দুরভিসন্ধিমূলক প্রচার করছে এবং প্রশাসনকে বিভ্রান্ত করে
তোলার অপচেষ্টা চালাচ্ছে। এমনকি ঢাকার শহর এলাকাকে হিংসাত্মক হিসেবে ব্যবহার করার অপচেষ্টাও
তারা করেছে।
এই
সভায় উপস্থিত আমার যুবক এবং ছাত্র বন্ধুরা, আমি তোমাদেরই একজন, যে কিনা তোমাদের জাতির
উন্নয়ন এবং তোমাদের বিকশিত জীবন গড়ে তোলার আকাঙ্ক্ষায়, গত পঞ্চাশ বছর ধরে আমার জীবনকে
উৎসর্গ করে দিয়েছি। ছাত্রসমাজ এবং যুবসমাজকে সব সময় ভিতরে টেনে পড়ে তাদের সম্ভাবনাকে
কাজে লাগাতে চেয়েছি। একজন নেতা হিসেবে তোমাদের কাছে আমার আহ্বান, তোমরা যদি কোন রাজনৈতিক
দলের সমর্থন করো তবু সে ভুল যেন তোমরা কখনও আর পুনরাবৃত্তি না করো। তোমরা মনে রেখো,
দেশটি এখন আমাদের। এটি একটি বিশাল অর্জন। বর্তমান সরকারটি আমাদের নিজেদের সরকার। আমরা
এখন গোলাম জাতি নই। আমরা এখন একটি স্বাধীন এবং সার্বভৌম রাষ্ট্রের মালিক। আমাদের দেশকে
আমরা কীভাবে চালাবো তা আমাদেরই ঠিক করে নিতে হবে। স্বাধীন দেশের নাগরিকদের মতো আচরণ
করতে হবে। কারো রাষ্ট্রীয় আদর্শে বা কোন বিদেশী কলোনীর মধ্যে এখন আমরা আর বাস করছি
না। আমরা গোলামী শিকল ছিঁড়ে ফেলেছি।
আমার
যুবকবন্ধুরা, আমার স্বপ্নের পাকিস্তানের তোমরাই নির্মাতা। তোমাদের কাছে আমার আকুল মিনতি,
তোমরা বিভ্রান্ত হয়ো না। কারো চক্রান্তের শিকার হয়ো না। তোমরা নিজেদের মধ্যে সুসংহত
ঐক্য এবং সংহতি গড়ে তোলো। যুবকরাই সবকিছু বদলে দিতে পারে, এমন নজির গড়ে তোলো। তোমাদের
আসল কাজ নিজেদের প্রতি সুবিচার করা। অর্থাৎ নিজেদেরকে যোগ্য নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলা।
পিতা-মাতাকে সম্মান করা আর স্বদেশ, স্বাধীনতা ও স্বজাতির কল্যাণে সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকারের
জন্য নিজেদের প্রস্তুত করে রাখা। তোমরা যদি লেখাপড়ায় গভীরভাবে মনোনিবেশ করতে পারো
তবে শিক্ষিত হয়ে উঠবে। শিক্ষিত জাতিই কেবল শক্তিশালী দেশ হতে পারে। আমি তোমাদেরকে
লেখাপড়ায় মনোযোগ দেওয়ার জন্য আকুল আহ্বান জানিয়ে গেলাম। তোমাদের শক্তি, প্রতিভাকে
যদি অপচয় করে ফেলো তাহলে তোমরাই ক্ষতিগ্রস্ত হবে এবং গভীর অনুশোচনায় সারাটা জীবন
দুঃখময় হয়ে যাবে। তোমরা কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়াশোনা শেষ করার পর, বিচার বিবেচনা
করার অধিকারী হয়েই, দেশকে গড়ে তোলার জন্য সঠিকভাবে অবদান রাখতে সক্ষম হবে। এতগুলি
কথার মধ্য দিয়ে, আমি তোমাদেরকে পুনরায় স্মরণ করিয়ে জানাতে চাই পাকিস্তান এবং পূর্ববাংলার
যে বিপদসমূহের কথা আগে বলেছি, তা আমাদের উপর থেকে এখনো কেটে যায়নি। আমাদের ঐতিহাসিক
দুশমনরা পাকিস্তান সৃষ্টির বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করছে। তারা এখনো বসে নেই। এখন তারা তাদের
কৌশল বদলাচ্ছে। তারা এখন আমাদের দেশে শৃঙ্খলা সৃষ্টির পায়তারা করছে। তারা ভালো করেই
জানে, আমাদের মধ্যে প্রাদেশিকতা, আঞ্চলিকতা জাগিয়ে তুলতে পারলে, আমরা বিভক্ত হয়ে
যাব এবং তাদের উদ্দেশ্য সফল হবে। আর আমরা যতক্ষণ না আঞ্চলিকতা এবং প্রাদেশিকতাকে আমাদের
মন, চিন্তা এবং রাজনীতি থেকে ছুঁড়ে ফেলতে পারবো ততদিন পর্যন্ত আমরা একটি শক্তিশালী
ও আধুনিক রাষ্ট্রের জন্য নিজেদেরকে প্রস্তুত করে তুলতে পারবো না। আমরা কী এই পরিচয়ে
পাকিস্তান করেছি যে, আমরা বাঙালী, পাঞ্জাবী, সিন্ধি, বেলুচি, পাঠান, ইত্যাদি ইত্যাদি।
এগুলো অবশ্যই আমাদের জাতিসত্তার এক একটি ইউনিট। আমি তোমাদের কাছে জিজ্ঞেস করতে চাই
তেরশত বছর আগে আমাদের কাছে যে দেহাতো এসেছে, সে কথা কী আমরা ভুলে গেছি?
আমি
ইতিহাসের সেই সত্য কথাটি বলতে চাই, এই পাকিস্তানে আমরা যে যেখানেই বাস করি, আমরা সকলে
বহিরাগত। এই বাংলায় যারা বাস করছেন, তারাও এখানকার আদি অধিবাসী নন। সুতরাং আমরা বাঙালী,
আমরা পাঠান, আমরা পাঞ্জাবী বলে কী লাভ? আমাদের সকলের প্রধান পরিচয় আমরা মুসলমান। ইসলাম
আমাদেরকে এই কথাই শিক্ষা দিয়েছে। আমি মনে করি তোমরা আমার সাথে একমত হবে যে, আগে আমরা
কী ছিলাম বা না ছিলাম, কিভাবে এখানে আসলাম, এ সবের প্রাসঙ্গিকতার চেয়ে, আমাদের প্রধান
পরিচয় আমরা মুসলমান।
প্রিয়
ছাত্রবৃন্দ, তোমাদের একটি স্বাধীন দেশ হয়েছে। এটা ছোট একটি জমির দেশ নয়। পাকিস্তান
নামে একটি বিরাট ভূখণ্ড তোমাদের হয়েছে। এই ভূখণ্ডটির মালিক কোন পাঞ্জাবী, কোন সিন্ধি,
কোন বেলুচি, কোন পাঠান, বা কোন বাঙালী নয়। এটি আমাদের সবার। তোমরা একটি কেন্দ্রীয়
সরকার পেয়েছো, যেখানে সকল ইউনিটের প্রতিনিধিত্ব রয়েছে। তাই বলতে চাই, তোমরা যদি একটি
সম্মানিত জাতি হিসেবে দুনিয়ার বুকে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে চাও তবে অহংকার কমিয়ে
তোমাদের কাজে নেমে পড়ো। তোমরা প্রাদেশিক হিংসা, আঞ্চলিক সংকীর্ণতা থেকে বেরিয়ে আসো।
শৃঙ্খলাবদ্ধতা এবং প্রাদেশিকতা আমাদের জন্য সবচেয়ে বড় অভিশাপ। বিবেদের আরও যেসব ইস্যু
রয়েছে, শিয়া-সুন্নী দ্বন্দ্ব এগুলোও দূরে সরিয়ে রাখো।
আমাদের
সমস্যা এবং বিবেদ নিয়ে, পরাধীন আমলের সরকারের মাথাব্যথা ছিল না। তারা এরূপ অবস্থায়
অস্তিত্ববোধ করতো না। তাদের লক্ষ্য ছিল নিজেদের দিকে। ভারতবর্ষকে শোষণ এবং যতভাবে শোষণ
করা যায় তাকে শোষণ করা। শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার কথা বলতে তারা শিখিয়েছে মানুষকে কেবল
আইন মানতে, কিন্তু আপনাদেরকে একটি উদাহরণ দিচ্ছি, বর্তমান আমেরিকার কথা ধরুন, তারা
যখন ব্রিটিশদের তাড়িয়ে তাদের দেশ থেকে বের করে দিতে সক্ষম হয়েছিল এবং স্বাধীনতা
ঘোষণা করেছিল, তখন তাদের দেশে এত জাতি-গোষ্ঠী ছিল, যা বর্ণনা করে শেষ করা যাবে না।
জার্মান, ফরাসী, আইরিশ, ইতালিয়ান, ইত্যাদি, ইত্যাদি। এরা নিজেদের ভিতর অভ্যন্তরীণ
বিভেদ, বিরোধিতা, শত সমস্যা নিয়ে সেখানে বাস করতো। আমেরিকানরা নিজেদের সমস্যাকে কাটিয়ে
পৃথিবীর একটি শক্তিশালী জাতিতে পরিণত হয়েছে। আর আমাদের ভিতর বিভেদের কোন অভাব নেই।
তাছাড়া, আমরা বরং আরো বিভক্ত করেছি। মনে করুন, আমেরিকায় ফরাসী বংশোদ্ভূত কেউ একজন
যদি বলে, আমি একজন ফরাসী। আমি পৃথিবীর অন্যতম এক শ্রেষ্ঠ জাতির সদস্য। আমার এমন এমন
গৌরব রয়েছে। অন্যরাও যদি অনুরূপ কথা বলতো, তাহলে পরিস্থিতি কোথায় গিয়ে দাঁড়াতো?
এর ফলে তারা নিজেদের সমস্যা উপলব্ধি করার যথেষ্ট শক্তি ছিল এবং অতি দ্রুততার সাথে তারা
তাদের ভেতরকার সমস্যাগুলি মিটিয়ে ফেলতে সক্ষম হয়েছে এবং স্ব স্ব জাতি, গোষ্ঠীর বিভেদের
দেয়ালকে সরিয়ে ফেলেছে। তারা নিজেদের জার্মান, ফরাসী, ইংরেজ, স্পেনিশ পরিচয় মুছে
দিয়ে জাতিগত চেতনায়, এক শক্তিশালী হয়ে ওঠে যে, তারা এখন গর্ব করে বলে থাকে আমি একজন
আমেরিকান অথবা আমরা আমেরিকান। সুতরাং এরকম করেই কি আমরা নিজেদের চিন্তা করতে পারি না?
আমরা সবাই কি আমাদের দেশ পাকিস্তান আর আমরা সবাই পাকিস্তানি, এই চেতনাকে হৃদয়ের ভিতর
প্রবেশ করিয়ে দিতে পারি না?
আমি
বারবার আপনাদের কাছে অনুরোধ করে যাচ্ছি আপনারা প্রাদেশিকতা এবং আঞ্চলিকতা থেকে নিজেদের
মুক্ত করে ফেলুন। পাকিস্তানের রাষ্ট্রব্যবস্থা বা রাজনীতিতে যদি প্রাদেশিকতার বিষ ঢুকে
যায়, আমরা কখনো শক্তিশালী জাতিতে পরিণত হতে পারবো না। পাকিস্তানকে একটি সমৃদ্ধ রাষ্ট্রে
পরিণত করার যে সংকল্প পোষণ করি, তা অর্জিত হবে না। আপনারা মনে করবেন না, আমি আপনাদের
পরিচয়ের অবমূল্যায়ন করছি। এরকম অবস্থার মধ্য দিয়েই ধ্বংসকারী দুষ্টচক্র জন্য নেওয়ার
সুযোগ পেয়ে যায়। যারা বাঙালীদের বলে পাঞ্জাবীরা বড় অহংকারী আর অবাঙালীদের বলে থাকে
বাঙালীরা এমন, এমন। এরা আমাদের পছন্দ করে না, তারা আমাদেরকে এদেশ থেকে বের করে দিতে
চায়। এরকম পরিস্থিতি সৃষ্টি করাই দুশমনদের কৌশল এবং চক্রান্তের বিস্তৃত জাল। এ ধরনের
অবিশ্বাস ও সন্দেহ আমাদের মধ্যে সৃষ্টি হয়ে গেলে সেটি সমাধান করা কারো পক্ষে সম্ভব
হবে বলে আমার মনে হয় না। দেশপ্রেমিক ভাইদের আহবান জানাই,এসবের প্রতি মনোযোগ দিবেন না।
দেশপ্রেমিক হতে হবে, একতার প্রতি আনুগত্য থাকতে হবে, একে অপরের প্রতি সহযোগিতা দিতে
হবে।
আপনারা
আমাকে ভালো বক্তা করেন, আরো বাস্তববাদী হন, আপনাদের দৈনন্দিন জীবনে শৃঙ্খলার শিক্ষা
গ্রহণ করুন। তাহলেই আপনারা সফল নাগরিক হতে পারবেন এবং বড় মানুষ ও বড় নেতা হতে পারবেন।
পাকিস্তানের জন্য আপনাদের সর্বোচ্চ ত্যাগ করতে হবে। দেশের সেবার জন্য আপনাদের মনপ্রাণ
দিয়ে কাজ করতে হবে। মনে রাখবেন, একজন নাগরিক হিসেবে মানুষের সেবা করা, সত্য, ন্যায়
এবং সৎ চরিত্র ধারণ করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সকল প্রকার অনাচার, অবিচার এবং অন্যায়ের
বিরুদ্ধে নিজেদের মুক্ত করে ফেলুন।
ভাষাকে
ইস্যু করে, যা কিনা আমি আগেও বলেছি, মুসলমানদের মধ্যে একটা বিভ্রান্তি সৃষ্টি করার
পাঁয়তারা চলছে। আপনাদের প্রধানমন্ত্রী সম্প্রতি যে বিবৃতি দিয়েছেন তাতে আমি সন্তুষ্ট।
তিনি বলেছেন, এ বিষয়কে ইস্যু করে মুসলমানদের মধ্যে কোন একতা নষ্ট করা হবে না এবং কোন
প্রতিক্রিয়াশীল রাজনৈতিক মহল, যদি প্রদেশে শৃঙ্খলা ভঙ্গ করতে চায় তবে তা কঠোর হাতে
দমন করার ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এই
প্রদেশের অফিসিয়াল ভাষা যদি বাংলা করতে হয় তবে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সম্পূর্ণ
এখতিয়ার নির্বাচিত প্রাদেশিক পরিষদের প্রতিনিধিদের রয়েছে। এবং তারাই তা নির্ধারণ
করবেন। আমি বিশ্বাস করি, এই সমস্যার সমাধান অবশ্যই এই প্রদেশের জনগণের আশা আকাঙ্ক্ষা
অনুযায়ী যথাসময়ে নির্ধারিত হবে। আমি পরিষ্কার ভাষায় একটা আপনাদের জানিয়ে রাখতে
চাই, বাংলা ভাষার প্রশ্ন নিয়ে এই প্রদেশবাসীর দৈনন্দিন জীবন-যাপন, চাকরি-বাকরিতে কোনরূপ
হতাশা, উদ্বেগ বা বিভ্রান্তি সৃষ্টি করার কারণ ঘটবে না। আবারও বলছি, এ প্রদেশের অধিবাসীরাই
তাদের প্রাদেশিক ভাষা যথাসময়ে নির্ধারণ করে নিতে পারবেন।
কিন্তু,
আমি আপনাদের কাছে এ কথাটি স্পষ্ট করে জানিয়ে রাখতে চাই, নিঃসন্দেহে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা
হতে হবে উর্দু। কোন প্রাদেশিক ভাষা রাষ্ট্রভাষা হতে পারে না। আর এ ব্যাপারে আপনাদেরকে
যারা বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করবে তারা অবশ্যই পাকিস্তানের শত্রু। কোন রাষ্ট্র যদি একটি
রাষ্ট্রভাষা না করতে পারে, তাহলে সে রাষ্ট্রটিকে একটি শক্তিশালী কেন্দ্রের বন্ধনে আবদ্ধ
করা যায় না। পৃথিবীর ইতিহাস এবং বড় বড় দেশগুলির দিকে আপনারা তাকালে বুঝতে পারবেন।
এসব দেশে রাষ্ট্রভাষা কয়টি এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রে একটি ভাষাকেই রাষ্ট্রভাষা হিসেবে
নির্ধারণ করা হয়েছে। সুতরাং, পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা উর্দুই হওয়া দরকার। তবে রাষ্ট্রভাষার
বিষয়টি ও এ মুহূর্তে অপ্রাসঙ্গিক কোন বিষয় নয়। সময়ের প্রয়োজনের সাথে মিলিয়ে,
রাষ্ট্রভাষা বিষয়টির সমাধান করা হবে।
বহুতবার
আমি বারবার যে কথা বলেছি, তা হলো, প্রিয় দেশবাসী, আপনারা পাকিস্তানের দুশমনদের মিথ্যা
কথার ফাঁদে পা দেবেন না। এসব দুশমনরা স্বদেশের এবং স্বজাতির বিরুদ্ধে কাজ করছে। দুনিয়া
জুড়ে এসব বিভ্রান্তি ছড়ানো হয়। যারা এগুলো বিশ্বাস করে তাদেরকে বলা হয় পঞ্চম বাহিনী
এবং নিশ্চিত যে, এদের পরিচয়ের মধ্যে মুসলিম নাম থাকলেও আমার এসব ভাইরা সর্বনাশের পথে
পা বাড়িয়েছে।
আমরা
কোন দেশদ্রোহমূলক তৎপরতাকে বরদাস্ত করবো না। আমরা পাকিস্তানের দুশমনদের সহ্য করবো না।
আমাদের দেশে কোন বিশৃঙ্খলাকে দেখতে চাই না। এসব পক্ষের বাহিনীর সদস্যরা তাদের অপতৎপরতা
এখানেই বন্ধ না করলে, আমার বিশ্বাস প্রাদেশিক ও কেন্দ্রীয় সরকার এসব অপতৎপরতার বিরুদ্ধে
ব্যবস্থা নিতে বাধ্য হবে। এরা আমাদের জাতির প্রধানতম শত্রু।
আমি
ভিন্নমত পোষণ করার অধিকারের বিষয়টি বুঝি এবং মানি। কেউ কেউ বলেন, আমাদেরকে কেন একটি
মাত্র পার্টিতে থাকতে হবে? অন্যটিতে নয় কেন? এ ব্যাপারে আমার মতের সাথে আশা করি আপনারাও
একমত হবেন যে, আমাদের অক্লান্ত পরিশ্রম এবং সংগ্রামের ফল হিসেবে, সর্বমোট ৭ মাস হলো
আমরা পাকিস্তানকে হাসিল করেছি। আর মুসলিম লীগের মাধ্যমেই এই অসাধ্য সাধন হয়েছে। অনেক
মুসলমানের কথা বলবো, তারা আমাদের আন্দোলনের ব্যাপারে উৎসাহী ছিলেন না বরং অনেক ক্ষেত্রে
বিরোধিতা করেছেন বা উদাসীন থেকেছেন। কেউ কেউ ভীত ছিলেন যে, পাকিস্তান হয়ে গেলে, তারা
সে সময় যে সুযোগ-সুবিধা বা ক্ষমতার ভাগ ভোগ করছিলেন, সেগুলো হারিয়ে ফেলবেন। এদের
অনেকেই আমাদের শত্রুদের সাথে হাত মিলিয়ে আমাদের বিরুদ্ধে তৎপর ছিলেন। আল্লাহর অসীম
মেহেরবানীতে সকল ষড়যন্ত্র, চক্রান্ত এবং বিরোধিতার বিরুদ্ধে প্রাণপণ সংগ্রাম করে আমরা
পাকিস্তানকে অর্জন করে এনেছি। সারা দুনিয়া অবাক বিস্ময়ে আমাদের এই ঐতিহাসিক ঘটনাকে
প্রত্যক্ষ করেছে। এজন্য মুসলিম লীগ আমাদের কাছে একটি পবিত্র আমানত। দেশবাসীর কল্যাণের
লক্ষ্যে এবং দেশকে রক্ষা করার অস্ত্র হিসেবে আমাদের এই পরীক্ষিত দলটিকে সুসংগঠিত করা
দরকার নয় কি? নাকি হঠাৎ গজিয়ে ওঠা দলসমূহ, যাদের নেতৃত্বে রয়েছে এমন সব লোকজন যাদের
অতীত নিয়ে প্রশ্ন তোলা যায়, তাদের হাতে পাকিস্তানের নেতৃত্ব তুলে দিলে তারা বহু ত্যাগের
বিনিময়ে পাওয়া দেশটির বিনাশ ঘটাবে না, তার কোন গ্যারান্টি আছে কি? দয়া করে জানাবেন,
আমি আপনাদের কাছে স্পষ্ট করে বলতে চাই, আপনারা কি পাকিস্তানকে গড়ে তুলতে চান? নাকি
ধ্বংস করতে চান? (স্লোগান: গড়ে তুলতে চাই)। তাহলে আপনাদের ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে। আপনাদের
মধ্যে শৃঙ্খলা থাকতে হবে এবং আইন মানতে হবে। তাহলেই আমরা এগিয়ে যেতে পারবো।
আমরা
সবাই পাকিস্তানকে গড়ে তোলার জন্য কাজ করবো। পাকিস্তানকে গড়ে এবং শক্ত করে তুলতে হবে।
আমাদের মধ্যে যারা বিভেদ সৃষ্টি করতে চায় তাদের বিরুদ্ধে সচেতন থাকতে হবে। আমরা যেন
কোন বিভেদের শিকার না হই এবং কোন প্রকার ষড়যন্ত্রের কাছে নতি স্বীকার না করি। দেশের
স্বার্থে আমাদের সবাইকে ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে।
আরেকটি
বিষয় বলবো। আপনারা বিভ্রান্ত হয়ে আছেন এটা আমি বলতে পারি না। অনেকেই আমাকে বলেছেন
যে, পূর্ব বাংলার জনগণ পাকিস্তানের অন্যান্য অংশ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে আছে, একাকার নয়।
যোগাযোগের সমস্যা আছে। হ্যাঁ, এটা সত্য। পাকিস্তানের পূর্ব এবং পশ্চিম অংশের মধ্যে
একটি ভৌগোলিক দূরত্ব রয়েছে। কিন্তু আমরা পাকিস্তানকে ঐক্যবদ্ধ রাখবো এবং যোগাযোগের
উন্নতির জন্য কাজ করে যাবো। আমাদের মধ্যে ভুল বোঝাবুঝি দূর করতে হবে।
আমি
আবার এখানে এক সপ্তাহ কিংবা দশদিনের জন্য এসেছি। আমার দায়িত্ব পালনের প্রয়োজনেই আমি
এখানে আসবো, থাকবো দিন পর দিন, সপ্তাহের পর সপ্তাহ এবং একই সাথে পাকিস্তানের কেন্দ্রীয়
সরকারের সাথে এই প্রদেশের সদা নিবিড় সম্পর্ক বজায় রাখবো। আমি আপনাদের মাঝে আসতেই
থাকবো এবং আপনাদের প্রতিনিধিবৃন্দ, নেতৃবৃন্দ, প্রাদেশিক সরকারের দায়িত্বশীল কর্মচারীবৃন্দ
পাকিস্তানের রাজধানী করাচিতে যাবেন এবং যেতে হবে। আপনারা ধৈর্য ধারণ করুন। আপনাদের
সহযোগিতা এবং ত্যাগের বিনিময়ে আমরা পাকিস্তানকে পৃথিবীর মধ্যে একটি সমৃদ্ধশালী দেশ
হিসেবে গড়ে তুলবো, ইনশাআল্লাহ।
সবশেষে
এই জনতার সমুদ্রের উদ্দেশ্যে শেষ কথাটি বলতে চাই—আপনারা এক থাকুন। এক সাথে থাকুন। দেশের
প্রতিটি মানুষের মুখে হাসি ফুটিয়ে তোলার জন্য আপনাদের আরো যদি দুঃখ-কষ্ট এবং পরিশ্রম
করতে হয়, এমনকি জীবন কোরবানী দিতে হয় তার জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে। আমার এ দায়িত্ব
শেষ করে, বক্তব্য শেষ করতে চাই। একটি জাতির কল্যাণের জন্য, একটি দেশকে গড়ে তোলার পেছনে
আপনাদের মেহনত বৃথা যাবে না। এই পথ বেয়েই আমরা পৃথিবীতে এক শক্তিশালী রাষ্ট্রের সম্মানিত
জাতি হিসেবে নিজেদের পরিচয় তুলে ধরতে পারবো। শুধু জনসংখ্যার হিসেবে পৃথিবীর পঞ্চম
বৃহৎ দেশ হয়ে থাকতে চাই না, সমৃদ্ধ এবং শক্তিশালী হয়েই আমরা পৃথিবীর অন্যান্য দেশ
এবং জাতিগোষ্ঠী থেকে শ্রদ্ধা ও সম্মান অর্জন করে নিতে চাই। মহান আল্লাহর দরবারে শুকরিয়া
জ্ঞাপন করছি এবং আমাদেরকে তৌফিক দানের জন্য মোনাজাত করছি।
পাকিস্তান
জিন্দাবাদ।
পাকিস্তান
জিন্দাবাদ।
পাকিস্তান
জিন্দাবাদ।
অনুবাদকের
কয়েকটি কথা
কায়েদে
আজম মুহাম্মদ আলী জিন্নাহকে প্রশ্ন করা হয়েছিল, পাকিস্তান কী উদ্দেশ্যে সাম্প্রদায়িক
রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত? তিনি বলেছিলেন, “না।” ভারতের সংখ্যাগরিষ্ঠ হিন্দু সম্প্রদায়ের
অত্যাচার থেকে বাঁচার জন্যই পাকিস্তান। ব্রিটিশদের প্রস্থান এবং হিন্দুদের অত্যাচারের
ফলে মুসলমানরা নিজেদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের দাবি তোলে।
জাতীয়তা, সংস্কৃতি, ভাষা ও ধর্মীয় স্বাধীনতা নিশ্চিত করার জন্যই পাকিস্তান প্রতিষ্ঠিত
হয়। ১৯৪৭ সালে জিন্নাহ ভারতের মুসলমানদেরকে পাকিস্তান নামের একটি সোনার হার উপহার
দিয়েছিলেন।
১৯৭১
সালে সেই সোনার হারটি ছিঁড়ে দু’টুকরা হয়ে যায়। বর্তমানে এর একটি হলো ১৮ কোটি জনসংখ্যার
পারমাণবিক শক্তিধর পাকিস্তান আর একটি হলো ১৬ কোটি মানুষের বিশাল সম্ভাবনাময় আমাদের
প্রিয় মাতৃভূমি স্বাধীন বাংলাদেশ। এই দুই দেশের প্রতিষ্ঠা, বিকাশ এবং ইতিহাসের সাথে
মুহাম্মদ আলী জিন্নাহর ভূমিকা স্বাভাবিকভাবেই চলে আসে।
বাংলাদেশের
মুসলমানদের কাছে এই শাসনতন্ত্রের চিন্তা এবং চেতনার সাথে ভুল ব্যাখ্যা করা হয়েছে।
যেমনটি, ১৯৪৮ সালের ২১শে মার্চ ঢাকার রেসকোর্স ময়দান—বর্তমানে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান—কায়েদে
আজমের ভাষণে তৎকালীন জনতার সামনে যে ভাষণ দিয়েছিলেন, তার প্রেক্ষাপটকে আড়াল করে কেবল
রাষ্ট্রভাষার প্রসঙ্গ তুলে তাকে অভিযুক্ত করা হয়। এমনকি আমাদের কাছে, সমগ্র দক্ষিণ
এশিয়ার অন্যতম এবং অবিস্মরণীয় দেশপ্রেমিক এই মহান নেতার চিন্তা এবং স্বপ্নকে খাটো
করে দেখানোর চেষ্টা হয়েছে।
সেই
ঐতিহাসিক ভাবনাটি নতুনভাবে পুনরায় পাঠ করার জন্য কায়েদে আজম জিন্নাহর ৫০তম মৃত্যুবার্ষিকীতে,
সে ভাষণের অনুবাদ নিয়ে এ ক্ষুদ্র বইটি বের করার প্রয়াস নেওয়া হয়েছে। পাকিস্তান
পাবলিকেশনের Jinnah’s Speeches বই থেকে মূল বক্তব্য গ্রহণ করা হয়েছে।
এ অনুবাদটি ক্ষুদ্রাকারে ছাপানোর জন্য নওয়াব সলিমুল্লাহ একাডেমীর শ্রদ্ধেয় সভাপতি জনাব আবদুল জব্বার উদ্যোগ নিয়েছেন। আমি তাই আবদুল জব্বার এবং তার শুভানুধ্যায়ীদের নিকট কৃতজ্ঞতা/ধন্যবাদ জ্ঞাপন করছি। আল্লাহ তাদের উদ্যোগকে কবুল করুন। আমিন।
সবশেষে সকল
প্রশংসা, আল্লাহর দরবারে পেশ করছি।
আলহামদুলিল্লাহ।
বিনীত
মেসবাহ উদ্দিন আহমদ
সেপ্টেম্বর
১৯৯৭, ঢাকা।
পরিমার্জিত প্রকাশঃ ডিসেম্বর ১৯৯৮, ঢাকা।
৩য় প্রকাশঃ ২০০১
৪র্থ প্রকাশঃ ৫ই আগস্ট, ২০১৫, ঢাকা।
