পাকিস্তান-আফগানিস্তান সীমান্ত সংঘাত ২০২৬: পর্দার আড়ালের প্রকৃত চিত্র

 


পাকিস্তান-আফগানিস্তান সীমান্ত সংঘাত ২০২৬: পর্দার আড়ালের প্রকৃত চিত্র

সম্প্রতি পবিত্র রমজান মাসে পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের মধ্যকার সামরিক উত্তেজনা এবং বিমান হামলা নিয়ে অনেকেই চিন্তিত। এই সংঘাতের মূল কারণ, প্রেক্ষাপট এবং বর্তমান পরিস্থিতি সংক্ষেপে ব্যাখ্যা করে আপনাদের সামনে তুলে ধরেছি |
গত ২২ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ তারিখে পাকিস্তানের উত্তর ওয়াজিরিস্তানে একটি চেকপোস্টে বড় ধরনের সন্ত্রাসী হামলা হয়। এতে পাকিস্তানের একজন লেফটেন্যান্ট কর্নেল ও একজন ক্যাপ্টেনসহ মোট ৭ জন সেনাসদস্য প্রাণ হারান। পাকিস্তান এই হামলার জন্য নিষিদ্ধ ঘোষিত সংগঠন তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তান (TTP)-কে দায়ী করে। তাই ২৭ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ তারিখে পাকিস্তানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী খাজা আসিফ আনুষ্ঠানিকভাবে আফগানিস্তানের বিরুদ্ধে "খোলাখুলি যুদ্ধ" (Open War) ঘোষণা করেন ।
পাকিস্তান এবার শুধু সীমান্ত এলাকা নয়, বরং আফগানিস্তানের অভ্যন্তরে কাবুল, কান্দাহার এবং পাকতিয়া শহরেও বিমান হামলা ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে। পাকিস্তান দাবি করেছে এই অভিযানে ১৩৩ জন আফগান তালেবান যোদ্ধা নিহত হয়েছে ।
অপরদিকে আফগান তালেবানও দাবি করেছে তারা পাকিস্তানের ২০টির মতো সীমান্ত পোস্ট দখল করে নিয়েছে এবং বহু পাকিস্তানি সেনাকে বন্দি করেছে (যদিও পাকিস্তান এই বন্দি করার বিষয়টি অস্বীকার করেছে)।
আন্তর্জাতিক ভেরিফাইড সোর্সগুলো (রয়টার্স, আল জাজিরা, বিবিসি) এবং স্থানীয় সূত্র থেকে প্রাপ্ত তথ্যে নিশ্চিত করেছে যে পাকিস্তানের এই বিমান হামলায় নারী ও শিশুসহ অন্তত ৮ জন বেসামরিক নাগরিক নিহত হয়েছেন। নিহতদের জানাজা এবং মৃতদেহের ছবি স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে, যা আফগানিস্তানের বেসামরিক নাগরিক নিহতের দাবিকে সত্য প্রমাণিত করে। কিন্তু পাকিস্তান দাবি করেছে যে তারা টিটিপি-র শীর্ষ কমান্ডারদের লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে এবং এতে বেশ কয়েকজন সন্ত্রাসী মারা গেছে। তবে এখন পর্যন্ত টিটিপি তাদের কোনো বড় নেতার মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করেনি বা পাকিস্তানও নিহত সন্ত্রাসীদের নাম-পরিচয় প্রকাশ করেনি। ফলে সন্ত্রাসীদের ক্ষয়ক্ষতির বিষয়টি এখনো কিছুটা অস্পষ্ট। তবে নিরপেক্ষ বিশ্লেষকদের মতে, টিটিপি যোদ্ধারা অনেক সময় সাধারণ মানুষের ঘরবাড়ির খুব কাছাকাছি অবস্থান করে। ফলে পাকিস্তান 'সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তুতে' হামলার দাবি করলেও, বাস্তবে সাধারণ মানুষের ঘরবাড়িতে বোমা পড়ার কারণে এই বড় ধরণের বেসামরিক প্রাণহানি ঘটেছে।
এবার আসেন আমরা তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তান (TTP) সম্পর্কে জানি | টিটিপি মূলত ২০০৭ সালে বাইতুল্লাহ মেহসুদের নেতৃত্বে গঠিত হয়। এটি আফগান তালেবান থেকে আলাদা একটি সংগঠন হলেও আদর্শিকভাবে তারা একই সুতায় গাঁথা। তারা পাকিস্তানের গণতান্ত্রিক সংবিধান মানে না এবং পুরো দেশে তাদের নিজস্ব কট্টরপন্থী শরিয়াহ আইন কায়েম করতে চায়। তারা আফগান তালেবান প্রধান হিবাতুল্লাহ আখুন্দজাদাকে তাদের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা হিসেবে গণ্য করে।
গত দেড় দশকে টিটিপি পাকিস্তানে কয়েক হাজার ছোট-বড় হামলা চালিয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ ছিল ২০১৪ সালের পেশোয়ারের আর্মি পাবলিক স্কুল (APS) হামলা, যেখানে ১৩২ জন শিশুসহ ১৫০ জনের বেশি মানুষ নিহত হয়। এই ঘটনার পর পাকিস্তান সেনাবাহিনী 'অপারেশন জার্ব-ই-আযব'-এর মাধ্যমে টিটিপি-কে পাকিস্তান থেকে প্রায় নির্মূল করে দেয়। তখন প্রাণ বাঁচাতে এদের বড় একটি অংশ আফগানিস্তানের দুর্গম পাহাড়ি অঞ্চলে পালিয়ে আশ্রয় নেয়।
২০২১ সালে আফগানিস্তানে তালেবান পুনরায় ক্ষমতায় আসার পর টিটিপি সেখানে নিরাপদ আশ্রয় পায়। এরই সাথে সাথে তারা মার্কিন বাহিনী আফগানিস্তান ছাড়ার সময় যে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের অত্যাধুনিক অস্ত্র (যেমন: নাইট ভিশন গগলস, এম-ফোর রাইফেল) ফেলে গিয়েছিল,সেগুলোর এক্সেস পেয়ে যায় । এই আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করেই তারা বর্তমানে পাকিস্তানের ভেতরে আরও নিখুঁত এবং প্রাণঘাতী হামলা চালাচ্ছে।
পাকিস্তান বারবার দাবি করেছে যে আফগান তালেবান যেন টিটিপি-কে তাদের মাটি ব্যবহার করতে না দেয়। কিন্তু আফগান তালেবান তাদের 'আদর্শিক ভাই' হওয়ার কারণে টিটিপি-র বিরুদ্ধে কোনো কঠোর ব্যবস্থা নিতে নারাজ। এই বিষয়টিই বর্তমানে ইসলামাবাদ ও কাবুলের মধ্যে চরম উত্তেজনার প্রধান কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
অপরদিকে পাকিস্তান দীর্ঘদিন ধরে অভিযোগ করে আসছে যে ভারত টিটিপি-কে অর্থ ও অস্ত্র দিয়ে সহায়তা করে যাতে পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা বিঘ্নিত হয়। পাকিস্তানের গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর দাবি, আফগানিস্তানের পূর্ববর্তী আশরাফ গনি সরকারের সময় ভারত সেদেশের কনসুলেটগুলো ব্যবহার করে টিটিপি-কে মদদ দিত। ভারত এই অভিযোগগুলো বরাবরই ভিত্তিহীন বলে উড়িয়ে দিয়েছে। ভারতের মতে, পাকিস্তান নিজেদের সৃষ্ট জঙ্গিগোষ্ঠীগুলো যখন তাদের ওপরই হামলা করছে, তখন দায় এড়াতে ভারতের নাম ব্যবহার করছে। আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের বড় একটি অংশ মনে করেন, টিটিপি মূলত পাকিস্তানের নিজস্ব নীতি ও উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত অঞ্চলের দীর্ঘদিনের ক্ষোভের ফসল।
এতো কিছু পরেও দুই পক্ষ আলোচনার মাধ্যমে সব সমাধান করতে চেয়েছিলো | ২০২১ সালে আফগানিস্তানে তালেবান ক্ষমতায় আসার পর পাকিস্তানের অনুরোধে তারা টিটিপি-র সাথে একটি আলোচনার পথ তৈরি করে দেয়। বিশেষ করে আফগান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সিরাজুদ্দিন হাক্কানি এই মধ্যস্থতায় বড় ভূমিকা পালন করেন। এর ফলে ২০২২ সালে একটি সাময়িক যুদ্ধবিরতিও ঘোষণা করা হয়েছিল।
আলোচনার টেবিলে টিটিপি এমন কিছু শর্ত দেয় যা পাকিস্তান রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বের জন্য হুমকিস্বরূপ ছিল। তারা দাবি করেছিল যে, পাকিস্তানের উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত অঞ্চল (সাবেক FATA) থেকে সেনাবাহিনী পুরোপুরি সরিয়ে নিতে হবে এবং ওই এলাকাকে পুনরায় স্বায়ত্তশাসিত উপজাতীয় অঞ্চল হিসেবে ঘোষণা করে সেখানে টিটিপি-র নিজস্ব শাসনব্যবস্থা কায়েম করতে দিতে হবে। স্বাভাবিকভাবেই পাকিস্তান এই দাবি মেনে নেয়নি।
২০২২ সালের শেষদিকে টিটিপি এককভাবে যুদ্ধবিরতি বাতিলের ঘোষণা দিয়ে পাকিস্তানে পুনরায় হামলা শুরু করে। পাকিস্তানের গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর মতে, টিটিপি আলোচনার নামে আসলে সময়ক্ষেপণ করেছিল যাতে তারা আফগানিস্তানে নিজেদের পুনরায় সংগঠিত করে নতুন শক্তিতে ফিরে আসতে পারে।
বর্তমানে পাকিস্তান সরকার "সন্ত্রাসীদের সাথে কোনো আলোচনা নয়" (No talks with terrorists) নীতি গ্রহণ করেছে। পাকিস্তান এখন সরাসরি আফগান তালেবান সরকারকে চাপ দিচ্ছে—হয় তারা টিটিপি-কে নিয়ন্ত্রণ করুক, নতুবা পাকিস্তান নিজের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে নিজেই সীমান্ত পেরিয়ে হামলা চালাবে (যা এই সাম্প্রতিক বিমান হামলার মাধ্যমে বাস্তবায়িত হয়েছে)।
অন্যদিকে, আফগান তালেবান টিটিপি-কে সরাসরি শত্রু হিসেবে ঘোষণা করতে রাজি নয়। তারা বিষয়টিকে পাকিস্তানের 'অভ্যন্তরীণ সমস্যা' বলে এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছে। ফলে দুই দেশের মধ্যকার কূটনৈতিক ও আলোচনার পথ এখন প্রায় পুরোপুরি রুদ্ধ।
রোজার মাসে এমন রক্তপাত মুসলিম বিশ্বের জন্য বেদনার। পাকিস্তান তাদের জনগণের কাছে বিষয়টিকে ‘দেশপ্রেম’ এবং ‘শহীদদের রক্তের প্রতিশোধ’ হিসেবে তুলে ধরছে। তাদের মতে, সন্ত্রাসীদের দমনে সময়ের চেয়ে জাতীয় নিরাপত্তা বেশি গুরুত্বপূর্ণ। অন্যদিকে আফগানিস্তান একে মুসলিম উম্মাহর ওপর আঘাত হিসেবে প্রচার করে আন্তর্জাতিক সহানুভূতি পাওয়ার চেষ্টা করছে।

বর্তমান পরিস্থিতিতে বোঝা যাচ্ছে যে, পাকিস্তান এখন আর আলোচনার টেবিলে নেই; তারা সরাসরি সামরিক অ্যাকশনের নীতি গ্রহণ করেছে। অন্যদিকে আফগান তালেবান টিটিপি-র ওপর নিয়ন্ত্রণ আনতে ব্যর্থ হওয়ায় বা অনিচ্ছুক হওয়ায় এই সংকট আরও দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিচ্ছে।

Post a Comment

Previous Post Next Post

Popular Items